তাইওয়ানের একটি সাধারণ পরিবার থেকে মাত্র ১০ বছরের ছোট শিশু জেরি ইয়াং যখন পরিবারের সাথে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় পাড়ি জমান, তখন তাঁর ঝুলিতে ইংরেজি বলতে ছিল কেবল একটিমাত্র শব্দ—”Shoe” (জুতো)। ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসেতে এসে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর প্রবাস জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখমুখী হতে হয় তাঁকে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক বা সহপাঠীদের কথা না বুঝতে পারা, নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারা এবং সংস্কৃতির সম্পূর্ণ ভিন্নতার কারণে প্রতিনিয়ত তীব্র হীনমন্যতা ও একাকীত্বে ভুগেছেন তিনি।
কিন্তু জেরি ইয়াংয়ের স্বভাবের মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত জেদ। তিনি নিজেকে গুটিয়ে না রেখে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইংরেজি অভিধানের পাতা উল্টে নতুন নতুন শব্দ মুখস্থ করতে শুরু করেন। সহপাঠীরা যখন খেলায় মগ্ন থাকত, ছোট জেরি তখন ব্যাকরণ ও উচ্চারণের কঠিন নিয়মগুলো আয়ত্ত করতে ঘাম ঝরাতেন। অদম্য অধ্যবসায় আর কঠোর পরিশ্রমের সুবাদে মাত্র ৩ বছরের মাথায় তিনি ইংরেজিতে সম্পূর্ণ সাবলীল হয়ে ওঠেন। শুধু তা-ই নয়, স্কুলের সেরা শিক্ষার্থীদের তালিকায় নিজের নাম লিখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। পরবর্তীতে তাঁর এই অসাধারণ মেধার জোরে তিনি ভর্তি হন বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সেখান থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৪ সাল। জেরি ইয়াং তখন স্ট্যানফোর্ডে ডক্টরেট (পিএইচডি) করছেন। সেই সময়ে ইন্টারনেট ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক প্রযুক্তি, যেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন তথ্য বা ওয়েবসাইট খুঁজে বের করার কোনো নির্দিষ্ট বা সহজ উপায় ছিল না। জেরি ইয়াং এবং তাঁর সহপাঠী বন্ধু ডেভিড ফাইলো মিলে স্ট্যানফোর্ডের ল্যাবে বসে শখের বশে চমৎকার কিছু ওয়েবসাইটের একটি তালিকা বা ডিরেক্টরি তৈরি করতে শুরু করেন। এই ব্যক্তিগত ক্যাটাগরি প্রজেক্টটির নাম তাঁরা ভালোবেসে রেখেছিলেন—”Jerry and David’s Guide to the World Wide Web”।
কিন্তু তাঁরা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি যে তাঁদের এই ছোট্ট শখের কাজটি ইন্টারনেট জগতের ইতিহাস বদলে দেবে! কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইন্টারনেটের প্রাথমিক ব্যবহারকারীরা তথ্য অনুসন্ধানের জন্য এই তালিকার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে শুরু করেন। সাইটটিতে ভিজিটরের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়তে থাকে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভার বারবার ক্র্যাশ করতে থাকে। জেরি উপলব্ধি করলেন, এটি আর সাধারণ কোনো একাডেমিক প্রজেক্ট বা ডিরেক্টরি নয়; এটিই হতে যাচ্ছে নতুন যুগের ডট-কম বিপ্লবের মূল প্রবেশদ্বার।
১৯৯৫ সালে তাঁরা প্রজেক্টটির একটি আকর্ষণীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নাম দেন—“Yahoo!” (Yet Another Hierarchical Officious Oracle)। ডক্টরেট পড়াশোনা মাঝপথে স্থগিত রেখে জেরি ইয়াং পুরোপুরি নেমে পড়েন ব্যবসায়িক ময়দানে। কিন্তু প্রবাস থেকে আসা দুই তরুণ ছাত্রের আইডিয়ায় অর্থ ঢালতে শুরুর দিকে প্রথাগত ব্যাংকগুলো দ্বিধাবোধ করছিল। তবে ডট-কম যুগের সম্ভাবনা উপলব্ধি করা দূরদর্শী ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা তাঁদের মেধা ও দূরদর্শিতার ওপর আস্থা রেখে তহবিল জোগাতে এগিয়ে আসেন।
পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে ‘ইয়াহু!’ কেবল একটি সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি রূপ নেয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টালে। ইমেইল সেবা, তাজা খবর, খেলাধুলার আপডেট, ফিনান্সিয়াল ডাটা এবং চ্যাট রুমের মতো বৈচিত্র্যময় সেবা নিয়ে ইয়াহু হয়ে ওঠে পুরো বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের সমার্থক রূপ। ডট-কম যুগে ইয়াহু পরিণত হয় শতকোটি ডলারের সবচেয়ে মূল্যবান ও প্রভাবশালী টেক জায়ান্টে। আর মাত্র একটি ইংরেজি শব্দ জানা সেই প্রবাসী তাইওয়ানিজ বালক জেরি ইয়াং বিশ্ব প্রযুক্তি অঙ্গনের তরুণ পোস্টার বয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
পরবর্তীকালে ২০০৫ সালে জেরি ইয়াং ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি চীনা ইকমার্স স্টার্টআপ ‘আলিবাবা’ (Alibaba)-র প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মার ওপর আস্থা রেখে ইয়াহুর পক্ষ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন। এটি বিশ্বের প্রযুক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে লাভজনক ও বুদ্ধিমান বিনিয়োগ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
জেরি ইয়াংশের জীবনপ্রবাহ প্রমাণ করে—ভাষাগত বাধা, অপরিচিত পরিবেশ কিংবা প্রবাস জীবনের প্রতিকূলতা কখনোই কোনো মানুষের মেধা ও সাফল্যকে আটকে রাখতে পারে না। সঠিক সময়ে নতুন সম্ভাবনার পথ চিহ্নিত করা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তা বাস্তবে রূপ দেওয়াই হলো একজন সত্যিকারের প্রদীপ্ত উদ্যোক্তার আসল পরিচয়।
উদ্যোক্তাদের শিক্ষা:
ভাষাগত সীমাবদ্ধতা জয় করা: নতুন দেশে এসে ভাষা না জানা কোনো স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা নয়। সদিচ্ছা থাকলে দ্রুত ভাষা ও সংস্কৃতি শিখে মূলধারায় প্রবেশ করা সম্ভব।
ফার্স্ট-মুভার অ্যাডভান্টেজ: যে বিষয়ে বাজারে এখনও প্রতিযোগি কম, সেখানে প্রথম পা রাখা উদ্যোক্তারা বাজার শাসনের বড় সুযোগ পান।
সঠিক সময়ে বিনিয়োগ করা: নিজের ব্যবসার পাশাপাশি সমসাময়িক সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোকে চিহ্নিত করে সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ যেমন আলিবাবাতে ইয়াংয়ের বিনিয়োগ ব্যবসাকে বহুদূর নিয়ে যায়।
