১৯৭৯ সাল। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে মোটেও সহজ ছিল না স্বাধীনভাবে বাঁচার জীবন। সমাজব্যবস্থার কঠিন সামাজিক ও রাজনৈতিক দেয়ালের কারণে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছিলেন অসাধারণ মেধাবী গণিতবিদ মিখাইল ব্রিন। মেধা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি পাচ্ছিলেন না, এমনকি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও পদে পদে বাধার মুখোমুখি হচ্ছিলেন। নিজের দেশের মাটিতে এই অন্যায় আর অন্ধকারের মাঝে তিনি সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে গভীরভাবে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। অবশেষে পরিবারের সুরক্ষা এবং সন্তানের জন্য একটি মুক্ত ভবিষ্যতের স্বপ্ন চোখে নিয়ে, মাত্র ৬ বছর বয়সী ছোট্ট ছেলে সের্গেই ব্রিনকে সাথে করে মিখাইল পাড়ি জমান এক অজানা গন্তব্যে—আমেরিকায়।
কিন্তু রূপকথার মতো এক নিমেষে বদলে যায়নি তাঁদের জীবন। অচেনা দেশ, একদম ভিন্ন ভাষা আর সম্পূর্ণ নতুন এক সংস্কৃতি। তার ওপর ছিল চরম অর্থনৈতিক সংকট। প্রবাস জীবনের শুরুর সেই দিনগুলো ছিল টিকে থাকার তীব্র সংগ্রাম। তবে প্রতিকূলতা যত বড়ই হোক, সের্গেইর বাবা-মা কখনও তাঁর ভেতরে শিক্ষার আলো নিভতে দেননি। তাঁরা ছেলেকে শিখিয়েছিলেন, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, মেধা আর শিক্ষাই একমাত্র শক্তি যা মানুষের কপাল বদলে দিতে পারে।
ছোটবেলা থেকেই বাবার পথ ধরে সের্গেই গণিত এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের কঠিন জটিল হিসাবগুলোর প্রতি এক অদ্ভুত ভালোবাসা আবিষ্কার করেন। তাঁর অসাধারণ মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের জোরে তিনি উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান ক্যালিফোর্নিয়ার ঐতিহ্যবাহী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর এই স্ট্যানফোর্ডে পা রাখাটাই তাঁর জীবনকে চিরতরে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
১৯৯৫ সাল। স্ট্যানফোর্ডে কম্পিউটার সায়েন্সে ডক্টরেট করার সময় সের্গেইর সাথে পরিচয় হয় ল্যারি পেজ নামের আরেক উদ্যমী ও ভীষণ মেধাবী তরুণের। দুজনের মানসিকতা আর চিন্তা ছিল দারুণ এক সুতোয় গাঁথা। তাঁরা খেয়াল করলেন, তৎকালীন বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়তে শুরু করলেও কোনো তথ্য খোঁজা ছিল অত্যন্ত বিরক্তিকর। তখনকার সার্চ ইঞ্জিনগুলো কোনো তথ্যের আসল গুণমান, প্রাসঙ্গিকতা বা গুরুত্ব বুঝতে পারতো না—শুধু এলোমেলো কিছু লিংক সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিত।
দুই তরুণ গবেষক এক পাগলাটে স্বপ্ন দেখলেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করবেন যা পুরো বিশ্বওয়েবের বিশৃঙ্খলা দূর করে দেবে। স্ট্যানফোর্ডের ছোট্ট এক ডর্ম রুমেই দিনরাত এক করে শুরু হলো তাঁদের গবেষণা। তাঁরা এমন এক বৈপ্লবিক অ্যালগরিদম আবিষ্কার করলেন, যা ওয়েব পেজগুলোর নিজেদের ভেতরের সংযোগ ও গুরুত্ব বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে সঠিক ফলাফলটি মানুষের সামনে এনে দেবে।
১৯৯৮ সালে ডর্ম রুমের সেই সাধারণ প্রজেক্টটি আনুষ্ঠানিক রূপ পেল—জন্ম হলো ‘গুগল (Google)’-এর। কিন্তু শুরুতেই সফলতা দরজায় কড়া নাড়েনি। অফিস নেওয়ার টাকা ছিল না, সার্ভার কেনার মতো পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না। অনেক বড় বড় কোম্পানি তাঁদের এই ধারণাকে পাত্তাই দেয়নি। তবে অভাবের কাছে হার না মানার শিক্ষা তো সের্গেই পেয়েছিলেন ছোটবেলাই! প্রবাস জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা অদম্য ইচ্ছাশক্তির সামনে অর্থনৈতিক সংকটও অবশেষে নতি স্বীকার করল। তাঁদের এই অভূতপূর্ব প্রযুক্তির সম্ভাবনা বুঝতে পেরে দূরদর্শী বিনিয়োগকারীরা মূলধন জোগাতে এগিয়ে এলেন।
বাকিটা ইতিহাস। সময়ের সাথে সাথে ‘গুগল’ কেবল একটি কোম্পানিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ডিজিটাল বিপ্লবে। “গুগল করা” শব্দটি আজ মানুষের দৈনন্দিন ভাষার অংশ। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ নিজের অগণিত প্রশ্নের উত্তরের জন্য এই গুগলের ওপর নির্ভর করে। পরবর্তীতে নিজেদের ব্যবসার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে তাঁরা গড়ে তোলেন মূল অভিভাবক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যালফাবেট (Alphabet)’।
আজকের দিনে সের্গেই ব্রিন বিশ্বের অন্যতম প্রধান শীর্ষ ধনকুবের ও প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। কিন্তু রূপকথার মতো মনে হওয়া এই বিশ্বজয়ের মূল ভিত্তি লুকিয়ে আছে সেই ৬ বছরের এক অভিবাসী বালকের স্মৃতিতে—যে কোনো ব্যাকআপ ছাড়া, কোনো পারিবারিক সুবিধা ছাড়া এক অজানা দেশে এসে কেবল নিজের মেধা, সঠিক শিক্ষা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে পুরো পৃথিবীকে নতুন আলো দেখিয়েছিল।
উদ্যোক্তাদের শিক্ষা:
প্রযুক্তির ক্ষমতা বোঝা: চিরাচরিত ব্যবসার গণ্ডি পেরিয়ে নিজের ধারণাকে স্কেল (Scale) করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার আবশ্যক। প্রবাসীদের উচিত নিজের ব্যবসাকে কোনো না কোনোভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা।
সমস্যার মূল শিকড় চিহ্নিত করা: গুগল তৈরির মূল কারণ ছিল ইন্টারনেটের বিশৃঙ্খলা দূর করা। আপনার ব্যবসা যদি বাজারের একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সঠিক সমাধান দিতে পারে, তবে গ্রাহক নিজেই আপনার পণ্য খুঁজে নেবে।
মানসম্পন্ন শিক্ষা ও নেটওয়ার্কিং: নতুন দেশে এসে কেবল অর্থ উপার্জনে মনোযোগ না দিয়ে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভালো প্রতিষ্ঠানের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদে বড় রিটার্ন দেয়।
