১৯৭১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়াতে এক দূরন্ত কিশোরের বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর একমাত্র আশ্রয় ছিল বইয়ের জাদুকরী জগত। প্রতিদিন শত শত পৃষ্ঠা পড়ে শেষ করা এই অদম্য মেধাবী তরুণটি ছিলেন ইলোন মাস্ক। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার সীমানা তাঁর বিশাল স্বপ্নের সামনে ছিল বড্ড ছোট। ১৭ বছর বয়সে কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক সাহায্য বা সামাজিক সুবিধা ছাড়াই একাকী পরিবারের পরিচিত গণ্ডি ছেড়ে তিনি পাড়ি জমান কানাডায়, আর সেখান থেকে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়।
আমেরিকাতে এসে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদালয়ে পড়ার সময় প্রবাস জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েন তিনি। চরম আর্থিক সংকটের কারণে দিনের পর দিন অতি সাধারণ খাবার খেয়ে, মাত্র এক ডলারের বাজেট সামলে জীবন কাটাতে হতো তাঁকে। তবে দারিদ্র্য বা কষ্ট কোনোদিনই তাঁর মনের ভেতর লুকানো বিশাল স্বপ্নকে ম্লান করতে পারেনি। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঐতিহ্যবাহী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদালয়ে পিএইচডিতে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইন্টারনেট বিপ্লবের তীব্র জোয়ার দেখে তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি। মাত্র দুই দিনের মাথায় স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছেড়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্যোক্তা হওয়ার ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ পথে।
১৯৯৫ সালে ইলোন এবং তাঁর ভাই কিম্বল মাস্ক মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘Zip2’ নামের একটি অনলাইন সিটি গাইড সফটওয়্যার কোম্পানি। প্রবাসের সেই শুরুর দিনগুলো ছিল অব বর্ণনীয় কষ্টের। তাঁদের কাছে কোনো বাসা ভাড়া নেওয়ার মতো টাকা ছিল না। ছোট্ট একটি অফিস ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানেই দিনরাত এক করে কাজ করতেন। রাতে অফিসের এক কোণে থাকা একটি সাধারণ সোফাতেই ঘুমাতেন আর সকালে কাছের এক ওয়াইএমসিএ (YMCA) সেন্টারে গিয়ে গোসল সেরে আসতেন। ওয়েবসাইট সচল রাখতে রাতে কোডিং করতেন এবং দিনে কাস্টমারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেন। অবশেষে ১৯৯৯ সালে কম্পিউটার জায়ান্ট কমপ্যাক (Compaq) যখন ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যে Zip2 কিনে নেয়, তখন তরুণ ইলোন মাস্ক প্রথম বড় ধরণের মূলধনের মুখ দেখেন।
কিন্তু আরামদায়ক জীবনযাপন করার জন্য ইলোন মাস্ক জন্ম নেননি। অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি তৈরি করেন X.com—যার লক্ষ্য ছিল প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবসাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। পরবর্তীতে এই কোম্পানিটি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে বিশ্বখ্যাত অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম ‘PayPal’-এ রূপ নেয়। ২০০২ সালে অনলাইন নিলাম সংস্থা ইবে (eBay) ১.৫ বিলিয়ন ডলারে পেপল কিনে নিলে ইলোন মাস্ক এক লহমায় শতকোটিপতি হয়ে ওঠেন।
একজন সাধারণ মানুষের জন্য এই বিপুল সম্পদ সারা জীবন আরাম-আয়েশে কাটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ইলোন মাস্ক আবার সব কিছু বাজি ধরলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, মানবতার সুরক্ষায় রকেট প্রযুক্তি এবং পরিবেশ রক্ষায় গ্রিন এনার্জিই হলো ভবিষ্যৎ। নিজের পেপল থেকে পাওয়া অর্জিত সমস্ত অর্থ তিনি দুটি অবিশ্বাস্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রজেক্টে ঢেলে দিলেন—মহাকাশ গবেষণার জন্য ‘SpaceX’ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য ‘Tesla’।
শুরুর দিকে সবাই তাঁকে পাগল ভেবে হেসেছিল। রকেটের একের পর এক পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হচ্ছিল, হাজার হাজার কোটি টাকা চোখের সামনে ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল। অন্যদিকে টেসলার গাড়ি তৈরিও পাচ্ছিল না কাঙ্ক্ষিত সফলতা। ২০০৮ সাল নাগাদ ইলোন মাস্কের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক জীবন চরম দেউলিয়া হওয়ার দোড়গোড়ায় পৌঁছে যায়। হাতের সমস্ত সঞ্চয় শেষ, লোন পাওয়ার কোনো আশা নেই, এমনকি বাসা ভাড়ার টাকা দিতেও বন্ধু-বান্ধবের কাছে হাত পাততে হচ্ছিল।
কিন্তু ইলোন মাস্কের অভিধানে ‘হার মানা’ বলে কোনো শব্দ ছিল না। ২০০৮ সালের শেষ প্রান্তে এসে স্পেসএক্সের চতুর্থ রকেট উৎক্ষেপণ সফল হয় এবং নাসা থেকে তাঁরা এক বিশাল চুক্তি পায়। অন্যদিকে টেসলাও বাজারে নিয়ে আসে নিজেদের বৈপ্লবিক মডেলের ই-কার।
বাকিটা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ইতিহাস। আজ স্পেসএক্স পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরি করে মহাকাশ ভ্রমণের খরচ এক-দশমাংশে নামিয়ে এনেছে এবং প্রথম বেসরকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানুষকে মহাকাশে পাঠিয়েছে। আর টেসলা বিশ্ব জুড়ে পেট্রোল-ডিজেল গাড়ির আধিপত্য গুঁড়িয়ে দিয়ে ইলেকট্রিক কারকে এনেছে মূলধারায়। ১ ডলার দিয়ে দিন কাটানো সেই একা দক্ষিণ আফ্রিকান অভিবাসী ছেলেটি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও প্রভাবশালী উদ্যোক্তাদের একজন, যিনি প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছেন—স্বপ্ন বড় হলে পুরো বিশ্বকে বদলে দেওয়া সম্ভব।
উদ্যোক্তাদের শিক্ষা:
চরম ঝুঁকি নেওয়ার সাহসিকতা: নতুন দেশে এসে ছোট চিন্তায় আটকে না থেকে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। সফল হতে হলে অনেক সময় নিরাপদ চাকরি বা পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে বড় ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা লাগে।
অদম্য সহনশীলতা (Resilience): প্রথম দিকের ব্যর্থতা কিংবা ক্যাশফ্লোর সংকট মানেই ব্যবসার শেষ নয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের লক্ষ্যের ওপর ১০০% ফোকাস ধরে রাখার ক্ষমতাই বিজয়ী নির্ধারণ করে।
ভবিষ্যতের বাজারে বিনিয়োগ: সাধারণ মানুষ আজ যা ভাবছে তা নিয়ে কাজ না করে, আগামী ৫ বা ১০ বছর পর বাজারের চাহিদা কী হবে—তা ভেবে উদ্ভাবনী ব্যবসায় নামা উচিত।
