দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে বাঁচতে মেক্সিকোর এক প্রত্যন্ত গ্রাম ছেড়ে ‘ব্রাসোরো’ (কৃষি চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক) প্রোগ্রামের আওতায় আমেরিকায় পাড়ি জমান এক তরুণ মেক্সিকান কৃষক—জেসুস কার্দেনাস। ক্যালিফোর্নিয়ার ধূ ধূ প্রান্তর ও প্রচ্ছায়া খামারগুলোতে তীব্র কাঠফাটা রোদে পিঠ পুড়িয়ে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা হাড়ভাঙা কায়িক পরিশ্রম করতেন তিনি।
প্রবাস জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। পকেটে কোনো জমানো টাকা ছিল না, ছিল না উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা ইংরেজি ভাষায় কথা বলার ন্যূনতম দক্ষতা। কিন্তু জেসুসের বুকের ভেতর জ্বলছিল এক অদম্য অগ্নিশিখা। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন—অন্যের জমিতে সারাজীবন ঘাম ঝরিয়ে দিনমজুর হয়ে বাঁচার জন্য তাঁর জন্ম হয়নি। নিজের মেহনতের সুফল তিনি নিজেই ভোগ করবেন এবং নিজের পরিবারকে একটি আত্মমর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ উপহার দেবেন।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পেটে ভাত কেটে এবং প্রতিটি সেন্ট জমিয়ে ১৯৬৯ সালে জেসুস ও তাঁর স্ত্রী লুস কার্দেনাস নিজেদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। নিজেদের গচ্ছিত সঞ্চয়ের সাথে ঘরের শেষ সম্বল কয়েকটি ছাগল ও মুরগি বিক্রি করে ক্যালিফোর্নিয়ার পোমোনা এলাকায় এক টুকরো ছোট খামার জমি ক্রয় করেন তাঁরা। সেই খামার থেকে তাজা ডিম, হাঁস-মুরগি ও ছাগলের মাংস সংগ্রহ করে তাঁরা স্থানীয় মেক্সিকান অভিবাসী পরিবারগুলোর দ্বারে দ্বারে গিয়ে বিক্রি করতে শুরু করেন।
ব্যবসা করার মাঝেই জেসুস এক অনন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা লক্ষ্য করলেন। সেই সময়ে ক্যালিফোর্নিয়া জুড়ে মেক্সিকান ও ল্যাটিনো অভিবাসীদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছিল। কিন্তু প্রথাগত আমেরিকান সুপারমার্কেটগুলোতে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী কোনো মশলা, তাজা টর্টিলা বা খাঁটি দেশীয় খাবার কিনতে পাওয়া যেত না। দূর পরবাসে এসে এই অভিবাসীরা নিজেদের মাতৃভূমির স্বাদ, গন্ধ ও সংস্কৃতির ছোঁয়া তীব্রভাবে মিস করছিলেন।
এই অপরিসীম চাহিদাকে পুঁজি করে ১৯৭৫ সালে জেসুস তাঁর খামারের ছোট্ট কোণেই প্রথম একটি সাধারণ মুদি দোকান চালু করেন। ভালোবেসে নাম রাখেন—‘Cardenas Markets’। দোকানে তিনি কেবল সাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসই রাখতেন না, বরং মেক্সিকো থেকে আনা বিশেষ মশলা, খামারের তাজা মাংস, গৃহিণীদের হাতে তৈরি গরম টর্টিলা এবং নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখতেন।
তবে কার্দেনাস মার্কেটসের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর পারিবারিক উষ্ণতা। জেসুস ও তাঁর স্ত্রী দোকানে আসা প্রতিটি মেক্সিকান প্রবাসী ক্রেতাকে একদম নিজের পরিবারের সদস্যের মতো আপন করে নিতেন। মাতৃভাষায় কুশল বিনিময়, হাসিমুখে সেবা দেওয়া এবং খাঁটি স্বadeshi পণ্যের সমাহার থাকার কারণে দোকানটি খুব অল্প দিনেই প্রবাসীদের নিরাপদ সামাজিক মিলনায়তনে পরিণত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মেক্সিকানরা গাড়ি চালিয়ে এই দোকানে কেনাকাটা করতে ভিড় জমাতেন।
ক্রেতাদের অভূতপূর্ব ভালোবাসা ও অবিরাম চাহিদার মুখ দেখে জেসুস কার্দেনাস আর পেছনে ফিরে তাকাননি। অর্জিত মুনাফা দিয়ে তিনি একের পর এক শাখা বাড়াতে শুরু করেন। একটি ছোট দোকানের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তোলেন আধুনিক সুবিধাসম্বলিত বিশালাকার সব সুপারমার্কেট।
আজকের দিনে ‘কার্দেনাস মার্কেটস’ ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা এবং অ্যারিজোনা রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত ডজন ডজন সুবিশাল মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের সুপারমার্কেট চেইনে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এই মেক্সিকান সুপারমার্কেট সাম্রাজ্য কেবল একটি লাভজনক ব্যবসা নয়, এটি মেক্সিকান-আমেরিকান সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক।
এক সাধারণ মেক্সিকান কৃষি শ্রমিকের জিরো থেকে কোটি কোটি ডলারের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার এই মহাকাব্য আমাদের শেখায়—প্রবাসে সফল হতে বিশাল মূলধন লাগে না। নিজের শেকড় ও কমিউনিটির প্রয়োজনকে সম্মান জানিয়ে খাঁটি সেবা ও কঠোর পরিশ্রম দিতে পারলে যেকোনো সাধারণ মানুষই ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে।
উদ্যোক্তাদের শিক্ষা:
নিজ সম্প্রদায়ের বাজার ধরে কাজ শুরু: নতুন দেশে এসে সরাসরি অপরিচিত আমেরিকান বাজারে লড়াই না করে, নিজের কমিউনিটির মানুষের অপূরণীয় চাহিদা মেটানো তুলনামূলক সহজ ও নিশ্চিত ব্যবসায়িক মডেল।
কাস্টমার রিলেশনশিপ ও পারিবারিক স্পর্শ: সুপারমার্কেট চেইনগুলোর মতো যান্ত্রিক না হয়ে গ্রাহকদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন ও প্রবাসীদের স্বদেশি অনুভূতি দেওয়া ছিল তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
ছোট অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে প্রসার: ছাগলের খামার থেকে ছোট মুদি দোকান, অতঃপর বিশালাকার সুপারমার্কেট—ব্যবসার অর্জিত মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ করে ধাপে ধাপে ব্যবসা বড় করাই নিরাপদ।
