দক্ষিণ কোরিয়ায় তখন তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছিলেন এক নবদম্পতি—ডো ওন চ্যাং এবং তাঁর স্ত্রী জিন সুক চ্যাং। নিজের দেশে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার মতো পরিস্থিতি না দেখে, তাঁরা একসময় সিদ্ধান্ত নেন দেশ ছাড়ার। পকেটে প্রায় কোনো টাকা-পয়সা ছিল না, ছিল না উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা ইংরেজি ভাষায় কথা বলার ন্যূনতম দক্ষতা। শুধুমাত্র অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর বেঁচে থাকার তাগিদ বুকে চেপে তাঁরা লস অ্যাঞ্জেলেসের মাটিতে পা রাখেন।
আমেরিকায় তাঁদের শুরুর দিনগুলো কোনো রূপকথার গল্প ছিল না, ছিল নিখাদ টিকে থাকার লড়াই। অপরিচিত শহর, অচেনা ভাষা আর পকেটে টান—সব মিলিয়ে চরম দুর্যোগময় পরিস্থিতি। পরিবারের মুখে দু’বেলা অন্ন তুলে দিতে ডো ওন চ্যাং একই সাথে তিনটি কঠোর শারীরিক পরিশ্রমে নিজেকে সঁপে দেন। ভোরবেলা উঠে তিনি একটি কফি শপে বাসন মাজতেন, দুপুরের কড়া রোদে পেট্রোল পাম্পে অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং দিন শেষে গভীর রাতে অফিস ঝাড়ুদার হিসেবে পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ করতেন। দিনে টানা ১৮ ঘণ্টা রক্ত পানি করা খাটুনির পর তিনি কেবল কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পেতেন। স্ত্রী জিন সুক চ্যাংও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না, তিনি পরিবারের খরচ কমাতে দর্জির কাজ ও ছোটখাটো সেলাইয়ের কাজ শিখতে শুরু করেন।
এই চরম কষ্টের মাঝেই ডো ওন চ্যাংয়ের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পেট্রোল পাম্পে কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করলেন, যেসব কাস্টমার চকচকে, দামী ও বিলাসবহুল গাড়ি চালিয়ে তেল নিতে আসতেন, তাঁদের বড় একটি অংশ পোশাক বা গার্মেন্টস ব্যবসার সাথে যুক্ত। কথা বানিয়ে ও আকার-ইঙ্গিতে তাঁদের সাথে আলাপ করে ডো ওন উপলব্ধি করলেন, এই বিশাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতেই লুকিয়ে আছে প্রবাসীদের ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি।
তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পোশাকের ব্যবসা শিখবেন। সামান্য বেশি আয়ের কাজ ছেড়ে তিনি স্থানীয় একটি তৈরি পোশাকের দোকানে কম বেতনের সেলসম্যানের চাকরি নেন। দিনরাত এক করে তিনি মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলেন—কীভাবে গ্রাহকদের সাথে কথা বলতে হয়, জামাকাপড় কীভাবে সাজিয়ে রাখতে হয়, কোন ডিজাইনের জামা মানুষ বেশি পছন্দ করে এবং কাপড়ের পাইকারি বাজার কীভাবে কাজ করে।
টানা তিন বছর পেট কেটে এবং ঘাম ঝরিয়ে জমানো মাত্র ১১,০০০ ডলার মূলধন নিয়ে ১৯৮৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে ৯০০ স্কয়ার ফিটের একটি ছোট্ট দোকান ভাড়া নেন এই দম্পতি। নাম রাখেন ‘Fashion 21’।
তাঁদের ব্যবসায়িক কৌশলটি ছিল এক কথায় মাস্টারস্ট্রোক। সেই সময়ে আমেরিকার বাজারে ট্রেন্ডি ফ্যাশনেবল পোশাকের দাম ছিল সাধারণ তরুণ-তরুণীদের নাগালের বাইরে। চ্যাং দম্পতি ঠিক করলেন, তাঁরা এশিয়ান ও আমেরিকান ট্রেন্ড মিলিয়ে একদম হালফ্যাশনের জামাকাপড় অত্যন্ত সুলভ মূল্যে বিক্রি করবেন। দোকানে জিন সুক চ্যাং নিজের চমৎকার রুশি দিয়ে পোশাক বাছাই ও ডিজাইনিংয়ের দিকটি সামলাতেন, আর ডো ওন চ্যাং সামলাতেন বিক্রি, মার্কেটিং ও হিসাব-নিকাশের কাজ।
ফলাফল পাওয়া গেল হাতে হাতে! দোকান খোলার প্রথম দিন থেকেই তরুণ-তরুণীদের উপচে পড়া ভিড় জমতে শুরু করে। মাত্র ৯০০ স্কয়ার ফিটের সেই ছোট দোকানটি প্রথম বছরেই বিক্রি করে ফেলে প্রায় ৭ লাখ ডলারের পোশাক!
এই অভাবনীয় সাফল্য তাঁদের সাহস বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবসার পরিধি বাড়াতে তাঁরা ব্র্যান্ডটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘Forever 21’। ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ (Fast Fashion) ধারণাকে নতুন মাত্রা দিয়ে তাঁরা বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৭টি দেশে ৮০০টিরও বেশি সুবিশাল স্টোর খোলেন। ৩টি কাজের দিনমজুর চ্যাং দম্পতির প্রতিষ্ঠিত ‘ফরেভার ২১’ পরিণত হয় কয়েক বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জায়ান্টে, যার বার্ষিক আয় ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
পরবর্তীকালে অনলাইন শপিংয়ের জোয়ার এবং অতিরিক্ত বিশ্বব্যাপী স্টোর সম্প্রসারণের ভুল কৌশলের কারণে ২০১৯ সালে কোম্পানিটিকে ব্যাংক্রাপ্সি বা দেউলিয়া সুরক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু সব হারিয়েও শূন্য থেকে একটি বিশ্ববিখ্যাত ফ্যাশন সাম্রাজ্য গড়ার ক্ষেত্রে এই কোরিয়ান দম্পতির অদম্য পরিশ্রম, ত্যাগ এবং দূরদর্শিতার ইতিহাস বিশ্বজুড়ে আজও কোটি কোটি প্রবাসী ও উদ্যোক্তার জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।
উদ্যোক্তাদের শিক্ষা:
কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনই আসল শিক্ষা: ব্যবসা শুরু করার আগে সেই খাতের ভেতরের মেকানিজম শেখা জরুরি। চ্যাং পেট্রোল পাম্পে পর্যবেক্ষণ এবং পোশাক দোকানে কাজ করে প্রাকটিক্যাল জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
কস্ট-ইফেক্টিভ বা বাজেট ফ্রেন্ডলি স্ট্র্যাটেজি: আমেরিকায় ‘Fast Fashion’ কনসেপ্ট এনে কম দামে ভালো ট্রেন্ডি পোশাক বিক্রি করা ছিল চতুর স্ট্র্যাটেজি। বাজেট সচেতন গ্রাহকদের টার্গেট করা সবসময় লাভজনক।
কঠোর পরিশ্রম ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: দৈনিক ১৮ ঘণ্টা খাটার মানসিকতা প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে দেয়। তবে ব্যবসা বড় হওয়ার পর অনলাইন ও নতুন ট্রেন্ডের সাথে সময়মতো মানিয়ে না নিলে ফরেভার ২১-এর মতো সংকটেও পড়তে হয়—যা থেকেও নতুন উদ্যোক্তাদের শিক্ষা নেওয়ার আছে।
